আল্লাহ্ বলেনঃ “তারা কি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকে সুপারিশকারী
গ্রহণ করেছে ? তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন ! তাদের কোন কিছুতে মালিকানা না থাকলেও এবং তারা
না বুঝলেও (সুপারিশ করতে পারবে) ? বলে দিন, যাবতীয় সুপারিশ আল্লাহরই আয়ত্বাধীন, আসমান
ও যমীনে তাঁরই সম্রাজ্য । অতঃপর তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে” (সূরা যুমারঃ
৪৩-৪৪)
আল্লাহ্ ব্যতীত সুপারিশের কেউ মালিক নয়, অধিকারী
নয়, অতএব তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে না । কেউ যদি আল্লাহর অনুমতি
না পেয়েই নিশ্চিতভাবে আখেরাতে সুপারিশ করতে পারবে এমন দাবী দুনিয়াতে করে বসে, তবে
সে যে নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করে নিল এবং মুশিরক হয়ে গেল তাতে কোন সন্দেহের
অবকাশ নেই ।
বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, হাশরের মাঠে মানুষ
যখন বিপদে পড়ে যাবে এবং অসহনীয় আযাবে গ্রেপ্তার হবে, তখন তারা একজন সুপারিশকারী খুঁজে
ফিরবে । যাতে করে তারা এই ভীষণ সংকট থেকে রেহাই পেতে পারে । প্রথমে তারা আদম (আঃ) এর
কাছে গমণ করবে । অতঃপর পর্যায়ক্রমে নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা (আঃ) এর কাছে যাবে । তাঁরা
কেউ সুপারিশ করতে সাহস করবেন না । প্রত্যেক নবী নিজেদের অক্ষমতার কথা প্রকাশ করবেন
। অবশেষে তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে আসবে । তিনি মানুষকে
এই বিপদজনক অবস্থা হতে মুক্ত করার জন্য আল্লাহর আরশের নীচে সিজদাবনত হবেন । আল্লাহর
প্রশংসা ও গুণকীর্তণ করবেন । তখন আল্লাহ্ তাঁকে মাথা উঠিয়ে প্রার্থনা করার অনুমতি
দিবেন । তিনি তখন সমগ্র মানুষের হিসাব-নিকাশের জন্যে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন ।
আল্লাহ তাঁর দুআ এবং শাফাআত কবুল করবেন । এটিই হল মাক্বামে মাহমূদ বা সুমহান মর্যাদা,
যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন (এ সম্পর্কে দীর্ঘ হাদিস বর্ণিত হয়েছে; দেখুন সহীহ্ বুখারী,
অধ্যায় তাওহীদ, অনুচ্ছেদঃ কিয়ামতের দিন নবী-রাসুল ও অন্যদের সাথে আল্লাহর কথা বলার
বিবরণ, হা/৬৯৫৬; সহীহ্ মুসলিম, অনুচ্ছেদঃ জান্নাতের সর্বনিম্ন মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি
হা/২৮৬)
পুলসিরাত পার হতে পীর নয় তাওহীদ দরকারঃ
পীর সাহেব আরো লিখেছেনঃ “হযরত থানবী লিখিয়াছেন, জনৈক
দরবেশ সাহেবের মৃত্যুর পর এক কাফন চোর কবর খুড়িয়া (দরবেশের) কাফন খুলিতে লাগিল ।
দরবেশ সাহেব চোরের হাত ধরিয়া বসিলেন । তা দেখে চোর ভয়ের চোটে চিৎকার মারিয়া বেহুঁশ
হইয়া মরিয়া গেল । দরবেশ স্বপ্নযোগে তার এক খলীফাকে আদেশ করিলেন চোরকে তার পার্শ্বে
দাফন করিতে । খলীফা এতে আপত্তি করিলে দরবেশ বলিলেনঃ কাফন চোরের হাত আমার হাতের সঙ্গে
লাগিয়াছে, এখন কেয়ামত দিবসে ওকে ছাড়িয়া আমি কেমনে পুলছেরাত পার হইয়া যাইব ?”
(ভেদে মারেফতঃ ২৭-২৮ পৃঃ)
একমাত্র তাওহীদ ও নেক আমলই মানুষকে পুলসিরাত পার করিয়ে
জান্নাতে নিয়ে যাবে । পীরের হাতে হাত রাখলে জান্নাত পাওয়া যাবে একথা কুরআন-সুন্নাতের
কোথাও নেই ।
পুলসিরাত পার হওয়ার সময় মুমিনদেরকে তাদের ঈমান ও
আমল অনুসারে আলো দেয়া হবে । যার আমল সবচেয়ে বেশী হবে তার আলো হবে পাহাড়ের মত বিশাল
। আর যার আমল সবচেয়ে কম হবে তার আলো হবে অতি ক্ষুদ্র, যা তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের
এক পাশে থাকবে । ঐ আলোকরশ্মিতে তারা পুলসিরাত পার হবে । মুমিন ব্যক্তি কেউ চোখের পলকে
কেউ বিদ্যুতের বেগে, কেউ ঝড়ের বেগে, কেউ পাখির মত, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার মত এবং কেউ
সাধারণ আরোহীর মত পুলসিরাত অতিক্রম করবে । “তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিরাপদে পার হবে, কারো
শরীরের গোস্ত ছিঁড়ে যাবে, কেউ আবার জাহান্নামে পড়ে যাবে” (বুখারী ও মুসলিম)
কিন্তু মুনাফেকরা কোন আলো পাবে না । তারা মুমিনদের
কাছে আলো ভিক্ষা চাইবে । তাদেরকে বলা হবে পিছনে ফিরে গিয়ে আলো অনুসন্ধান করো । আলোর
খোঁজে ফিরে গেলে তাদের মাঝে এবং মুমিনদের মাঝে একটি দেয়াল খাড়া করে দেয়া হবে ।
(সূরা হাদীদঃ ১৩)
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আমার
উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে । ওরা হচ্ছে এমন লোক
যারা ঝাড়-ফুঁক করে না, কারো কাছে ঝাড়-ফুঁক চায় না, পাখি উড়িয়ে ভাল-মন্দ নির্ধারণ
করে না । তারা আল্লাহর উপর পরিপূর্ণরূপে ভরসা করে” (বুখারী, অনুচ্ছেদঃ যারা ঝাড়-ফুঁক
করে না হা/৫৩১১, ৬০৫৯ ও মুসলিম, অনুচ্ছেদঃ মুসলমানদের মধ্যে কিছু লোক বিনা হিসাবে বিনা
আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন তার দলিল, হা/৩২০, ৩২৩)
আল্লাহ্ তাআলা বলেন: “যারা ঈমান এনেছে এবং তারা তাদের
ঈমানকে শির্কের সাথে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা আর তারাই হল সুপথ
প্রাপ্ত” (সূরা আনআম: ৮২)
অর্থাৎ যারা ঈমান আনার পর একনিষ্ঠ থেকেছে, খালেসভাবে
আল্লাহর ইবাদত করেছে এবং তাঁর ইবাদতে কাউকে শরীক করেনি তারা কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের
শাস্তি থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে এবং তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে সুপথ প্রাপ্ত (তাফসীর
ইবনে কাসীর ৩/২৯৪ পৃঃ সূরা আনআমের ৮২ নং আয়াতের তাফসীর)
আবু যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্
(ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
আল্লাহ্ বলেন, “যে ব্যক্তি পৃথিবী পূর্ণ পাপ নিয়ে
আমার কাছে আসবে এ অবস্থায় যে আমার সাথে কাউকে শরীক করেনি, তবে অনুরূপ (পৃথিবী পূর্ণ)
মাগফিরাত নিয়ে আমি তার সাথে সাক্ষাত করব” (মুসলিম, অধ্যায়ঃ যিকির, দু’আ, তওবা ও ইস্তেগফার,
অনুচ্ছেদঃ যিকির, দু’আ তওবা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ফযীলত হা/৪৮৫২)
মুআয বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, মুআয ! তুমি কি জান বান্দার
উপর আল্লাহর দাবী কি ? আর আল্লাহর উপর বান্দার দাবী কি ? তিনি বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর
রাসূলই অধিক জানেন । নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর
দাবী হচ্ছে তারা এককভাবে তাঁর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না । আর আল্লাহর
উপর বান্দার দাবী হচ্ছে, যে বান্দা শির্ক মুক্ত ইবাদত করবে তিনি তাকে শাস্তি দিবেন
না” (বুখারী ও মুসলিম)
আমাদের শিরক সম্পর্কে জানা প্রয়োজন । আল্লাহ শিরক
সম্পর্কে কোরআন বলেছেন-
সূরা নিসা-৪৮, ১১৬> নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শিরকের
গুনাহ মাফ করেন না ।
সূরা যুমার-৬৫> হে নবী আপনাকে প্রত্যাদেশ করা যাইতেছে
এবং আপনার পুর্ববর্তীদেরও প্রত্যাদেশ করা হয়েছিল যে, যদি আপনি আল্লাহ সাথে শিরক করেন
তাহলে আপনার সব আমল বাতিল হবে এবং আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্থদের অর্ন্তভূক্ত
সূরা আনআম-৮৮> এটি আল্লাহর হেদায়েত । স্বীয় বান্দাদের
মধ্যে যাকে ইচ্ছা, এপথে চালান । যদি তারা শেরেকী করত, তবে তাদের কাজ কর্ম তাদের জন্যে
ব্যর্থ হয়ে যেত ।
অতএব শিরক করলে আমলসমূহ ধ্বংস হয়ে যায় ।
সর্বশেষ যেই ডেন্জারাস আয়াত । সেটা হলো
মাযার ও কবরপূজা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত । আর যারা
শিরক করে তাদের উপর আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতকে হারাম করেছেন ।
আল্লাহ তাআলা বলেন: নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে,
তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন । আর যালিমদের
কোন সাহায্যকারী নেই । (সূরা মায়েদা, আয়াত ৭২)
সূরা নিসা-১১৫> যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে,
তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি
তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব । আর
তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান ।
কারণ আল্লাহর নিকট এখলাসপূর্ণ শিরকমুক্ত ইবাদাতও গ্রহণযোগ্য
(সূরা যুমার-৩)
রাসুল (সঃ) বলেন- বিদআতিদের নামায, রোযা, হজ্জ, উমরাহ,
জিহাদ, যাকাত এবং ফরজ নফল কোন এবাদতই আল্লাহর নিকট কবুল হবে না । তারা ইসলাম থেকে সেরুপ
ভাবে খারিজ হয়ে যাবে, যেভাবে আটা থেকে চুল পৃথক হয়ে যায় (ইবনে মাযাহ ইঃ ফাঃ ১ম খন্ড
হাঃ ৪৯)
আরবের মুশরিকদের শিরক কি ছিল ?
মহান রাব্বুর আলামীন বলেন- “হে পয়গম্বর
! আপনি মুশকদেরকে জিজ্ঞেস করুন যে, বল তো কে তোমাদেরকে আসমান জমিন থেকে রুযী দেন
? এবং কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক ? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং
কে মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন ? কে করেন কর্মসম্পাদনের ব্যবস্থাপনা ? তারা পরিস্কার
বলবে যে, মহান আল্লাহ (সূরা ইউনুস-৩১)
আল্লাহ তায়ালাই মূল ক্ষমতার অধিকারী একথা আরবের মুশরিকরাও
বিশ্বাস করতো, তারপরও তারা কাফের কেন ?
এই সূরার প্রথমাংশে মহান রাব্বুল আলামীন এ প্রশ্নের
জবাব দিয়ে দিয়েছেন । ইরশাদ হচ্ছে- আর তার (মুশরেকরা) আল্লাহ
ভিন্ন এমন কতিপয়ের ইবাদত করে, যারা তাদের কোন অপকারও করতে পারেনা
এবং তাদের কোন উপকারও করতে পারেনা, ও তারা বলে-এরা হল আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের
সুপারিশকারী । (হে রাসূল!) আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ তায়ালাকে এমন বিষয়ের সংবাদ
দিচ্ছ যা আছে বলে তিনি (নিজেও) জানেন না, না আসমানে না জমিনে ! তিনি তাদের শিরকী কার্যকলাপ
হতে পবিত্র ও অনেক ঊর্দ্ধে (সূরা ইউনুস-১৮)
দেখা গেল তারা এ অসীলা গ্রহণের কারণেই শিরকে লিপ্ত
হয়ে পড়লো । আর এ শিরকের বিরুদ্ধে তাওহীদের দাওয়াতের জন্যই আল্লাহ তাআলা রাসূলগণকে
পাঠালেন যুগে যুগে, প্রতিটি জনপদে । এ সকল দেব-দেবীর কাছে যেমন প্রার্থনামূলক দুআ করা
শিরক তেমনি সাহায্য প্রার্থনা করে দুআ করাও শিরক ।
আল্লাহ তাআলা বলেন: বল, তাদেরকে ডাক, আল্লাহ ছাড়া
তোমরা যাদেরকে (উপাস্য) মনে কর । তারা তো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার ও পরিবর্তন
করার ক্ষমতা রাখে না (সূরা ইসরা, আয়াত ৫৬)
যারা একদিন লাত উজ্জা প্রভৃতি দেব-দেবীর পূজা করতো,
তারা কিন্তু এ বিশ্বাস করতো না যে এগুলো হল তাদের প্রভূ বা সৃষ্টিকর্তা । বরং তারা
বিশ্বাস করতো এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে বা তাদেরকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ
করে তারা আল্লাহ নৈকট্য অর্জন করবে । তারা এটাও বিশ্বাস করতো না যে, এ সকল দেব-দেবী
বৃষ্টি দান করে বা রিযক দান করে ।
তারা বলতো: আমরা তো তাদের ইবাদত করি এ জন্য যে তারা
আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে । (সূরা যুমার, আয়াত ৩)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: বল, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে
ইলাহ মনে করতে তাদেরকে আহবান কর । তারা আসমানসমূহ ও যমীনের মধ্যে অণু পরিমাণ কোন কিছুর
মালিক নয় । আর এ দুয়ের মধ্যে তাদের কোন অংশীদারিত্ব নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ
তাঁর সাহায্যকারীও নয় । আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন সে ছাড়া তাঁর কাছে কোন সুপারিশ
কোন কাজে আসবে না । (সূরা সাবা, আয়াত ২২-২৩)
আল্লাহ তাআলা ব্যতীত যা কিছুর উপাসনা করা হয়, তা সবই
বাতিল । আল্লাহ তাআলা বলেন: আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে
পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না । অতএব তুমি যদি কর, তাহলে নিশ্চয় তুমি যালিমদের
অন্তর্ভুক্ত হবে । আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার
কেউ নেই । আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই
। তিনি তার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন । আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু
(সূরা ইউনূস, আয়াত ১০৬-১০৭)
যখন তারা সবই বাতিল, তাদের কাছে দুআ-প্রার্থনা করলে
যখন কোন উপকার হয় না তখন কেন তাদের স্মরণাপন্ন হবে ? কেন তাদেরকে অসীলা গ্রহণ করা
হবে ? কেন তাদের কবরে যেয়ে দুআ করা হবে ?
বিজ্ঞ পাঠক পাঠিকার কাছে আমার আবেদন-আপনারা শান্ত মস্তিস্কে
একটু ভেবে দেখুন, আমাদের দেশে মাজার পূজা আর কবর পূজার
নামে মুসলমানদের কিভাবে মুশরিক বানানো হচ্ছে সুপরিকল্পিতভাবে ।
একবার যদি মন থেকে কেউ ঈমান আনে, আর সারা জীবন নাফরমানীও
করে তবুও তার নাফরমানীর শাস্তি পেয়ে জান্নাতি হবার সুযোগ আছে । কিন্তু কেউ যদি শিরক করে
মুশরিক হয় তাহলে তাকে আল্লাহ তায়ালা কখনো মাফ করবেন না । তার জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম
।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের কবর পূজা ও মাযার পূজা এবং পীর
পূজা করে মুশরিক হওয়া থেকে হিফাযত করুন ।
মৃত্যু ব্যক্তি বা কবরে মাযারে শায়িত ব্যক্তির কাছে
চাওয়া, পাওয়া কি সম্ভব ?
অনেক মানুষ মনে করে অলি আউলিয়া, পীরগণ মৃত্যু বরণ
করে না ।
সূরা আল ইমরান-১৮৫> প্রত্যেক প্রাণীই মৃতু্র স্বাদ
ভোগ করবে ।
কবরবাসী সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-সূরা নাহল-২১ > তারা
মৃত, প্রাণহীন । কবে পুনরুত্থিত হবে জানে না ।
অনেকে বলে অলি আউলিয়াগণ মরার পরেও মানুষের কথা শুনে
যখন মানুষ কবরের সামনে গিয়ে তাদের পুজা করে বা তাদের কাছে কিছু চায় ।
আল্লাহ কোরআনে বলেছেন সূরা ফাতির-২২>হে নবী, তুমি
কবরে শায়িতদের কথা শুনাতে সক্ষম না ।
আল্লাহ নবীকে সম্বোধন করে বলেছেন: নিশ্চয় তুমি মৃতকে
শোনাতে পারবে না, আর তুমি বধিরকে আহবান শোনাতে পারবে না (সূরা নামল, আয়াত ৮০)
একই কথা সূরা রুম এর ৫২ নং আয়াতেও বলা হয়েছে ।
যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তু (কবর) কে ডাকে
সে কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সারা দিবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে
? তারা তাদের ডাক সম্পর্কে খবরও রাখে না । যখন মানুষ কে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা
হবে, তখন তারা (কবরবাসী) তাদের শত্রু হবে এবং তাদের ইবাদতের কথা অস্বীকার করবে (আহকাফ
আয়াত ৫, ৬)
বলুনঃ তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট
করতে চান তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে
? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চান তাহলে কি তারা সে অনুগ্রহ পতিরোধ করতে পারবে
? বলুন আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট । নির্ভরকারীরা তাঁরই উপর নির্ভর করে (আয-যুমার আয়াত
৩৮)
যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন
মৃতকে কিছু শোনাতে পারেন না, তখন সাধারণ মানুষ কিভাবে এ অসাধ্য সাধন করতে পারে ?
“নিশ্চয়ই আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি ও তোমারই
নিকট সাহায্য চাই” (সুরা ফাতিহাঃ ৫)
এবার আসুন দেখি কবর পূজারীদেরর কর্মকান্ড হাদিসের মানদন্ডেঃ-
ওমর রা. দুআর সময় আব্বাস রা. কে অসীলা হিসাবে গ্রহণ
করেছিলেন, এ বিষয়টি দিয়ে অনেকে মৃত ব্যক্তির অসীলা গ্রহণ করার বৈধতা দেয়ার প্রয়াস
পান । কিন্তু ওমর রা. আব্বাস রা. এর দুআকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেছেন তার ব্যক্তিত্বকে
নয় । আর আব্বাস রা. তখন জীবিত ছিলেন । যে কোন জীবিত ব্যক্তির দুআকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ
করা যায় । ওমর রা. তা-ই করেছেন । তিনি বলেছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম জীবিত থাকাকালে আমরা তার অসীলা দিয়ে দুআ করতাম । এখন তিনি নেই তাই আমরা তার
চাচা আব্বাসকে দুআ করার ক্ষেত্রে অসীলা হিসাবে নিলাম । ওমর রা. এর এ বক্তব্যে স্পষ্ট
হল যে, তিনি কোন মৃত ব্যক্তিকে দুআর সময় অসীলা হিসাবে গ্রহণ বৈধ মনে করতেন না । তিনি
নবী হলেও না ।
বিষয়টা এমন, যেমন আমরা কোন সৎ-নেককার ব্যক্তিকে বলে
থাকি, আমার জন্য দুআ করবেন । কোন আলেম বা বুযুর্গ ব্যক্তির মাধ্যমে আমরা নিজেদের জন্য
দুআ করিয়ে থাকি । এটাও এক ধরণের অসীলা গ্রহণ । এটা বৈধ
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে
বলেছেন: মৃত ব্যক্তি নিজের কোন উপকার করতে পারে না ।
তিনি বলেছেন: মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার আমল
বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু তিনটি কাজের ফল সে পেতে থাকে ।
১. ছদকায়ে জারিয়াহ (এমন দান যা থেকে মানুষ অব্যাহতভাবে
উপকৃত হয়ে থাকে) ২. মানুষের উপকারে আসে এমন ইলম(বিদ্যা) ৩. সৎ সন্তান যে তাঁর জন্য
দুআ করে । বর্ণনায়: মুসলিম
অনেক বিভ্রান্ত লোককে বলতে শুনা যায়, অমুক অলীর মাজার
যিয়ারত করতে গিয়েছিলাম । সেখানে যেয়ে এই দুআ করেছিলাম । দুআ কবুল হয়েছে, যা চেয়েছিলাম
তা পেয়ে গেছি ইত্যাদি । এ ধরনের কথা-বার্তা আল্লাহ তাআলার প্রতি মিথ্যারোপের শামিল
।
হ্যা, হতে পারে তবে অর্জন হলে সেটা
প্রার্থীত বিষয়টি পুরণ করা শুধু আল্লাহ তাআলার পক্ষেই
সম্ভব, তাহলে বুঝতে হবে এ বিষয়টি অর্জনের কথা তাকদীরে আগেই লেখা ছিল । কবরে শায়িত
ব্যক্তির বরকতে এটির অর্জন হয়নি ।
তাই সকল বিবেকসম্পন্ন মানুষকে বুঝতে হবে যে মাজারে
যেয়ে দুআ করলে কবুল হয় বলে বিশ্বাস করা সর্বাবস্থায়ই কুসংস্কার । কেহ যদি মাজারে
যেয়ে দুআ প্রার্থনা করে, মাজার পূজা করে মানুষ থেকে ফেরেশতাতে পরিণত হয় তাহলেও বিশ্বাস
করা যাবে না যে, এটা মাজারে শায়িত ব্যক্তির কারণে হয়েছে । এর নামই হল ঈমান । এর নামই
হল নির্ভেজাল তাওহীদ । তাওহীদের বিশ্বাস যদি শিরকমিশ্রিত হয়, কু সংস্কারাচ্ছন্ন হয়
তা হলে মুক্তি নেই ।
১. স্বীয় কবরকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান করাকে নিষিদ্ধ
করে আল্লাহর নবী ইরশাদ করেন- “তোমরা স্বীয় ঘরকে কবর
বানিয়োনা । (অর্থাৎ কবরের ন্যায় ইবাদত-নামায, তেলাওয়াত ও যিকির ইত্যাদি
বিহীন করনা) এবং আমার কবরে উৎসব করোনা ।(অর্থাৎ বার্ষিক, মাসিক বা সাপ্তাহিক কোন আসরের
আয়োজন করনা) তবে হ্যাঁ আমার উপর দুরূদ পাঠ কর । নিশ্চয় তোমরা যেখানেই থাক না কেন
তোমাদের
দুরূদ আমার নিকট পৌঁছে থাকে ।(আল্লাহ তায়ালার ফেরেশতারা পৌঁছিয়ে দেন)” (সুনানে আবু দাউদ:
হাদিস নং-২০৪৪/৪০; আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ মানাসেক, অনুচ্ছেদঃ কবর যিয়ারত, হা/১৭৪৬; দ্রঃ
সহীহুল জামে আলবানী হা/৭২২৬)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- রাসূলে সাঃ নিজ রওযা মুবারকে
উৎসব (উরস) পালন করতে বারণ করেছেন । তাহলে অন্য কে
আর এমন আছে যার কবরে তা বৈধ হবে ?
হাদিসের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার আল্লামা মুনাভী রহঃ এই
হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন- “এ হাদিস
থেকে বুঝা যায় যে, সাধারণ মানুষ যারা বছরের কোন নির্দিষ্ট মাসে বা দিনে (উরসের নামে)
ওলীদের
মাযারে একত্রিত হয় এবং বলে-আজ পীর সাহেবের জন্ম বার্ষিকী (মৃত্যু বার্ষিকী), সেখানে
তারা পানাহারেরও
আয়োজন করে, আবার নাচ গানেরও ব্যবস্থা করে থাকে, এ সবগুলিই শরীয়ত পরিপন্থী ও গর্হিত
কাজ । এ সব কাজ প্রশাসনের প্রতিরোধ করা জরুরী (আউনুল মা’বুদ-৬/২৩)
২. কবরের সামনে বাতি প্রজ্জ্বলন করাকে হারাম সাব্যস্ত
করে রাসূলে কারীম সাঃ ইরশাদ করেন- “হযরত
ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর নবী সাঃ অভিশম্পাত করেছেন (বেপর্দা) কবর যিয়ারতকারীনী
মহিলাদের উপর, এবং সেসব লোকদের উপর যারা কবরকে মসজিদ বানায় (কবরকে সেজদা
করে) এবং সেখানে বাতি প্রজ্জ্বলিত করে (জামি তিরমীযী-২/১৩৬)
উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর
অভিশম্পাত করেছেন আল্লাহর নবী সাঃ ।
৩. আল্লাহ ছাড়া কারো নামে মান্নত বা কুরবানী করা যায়না
। কারণ মান্নত ও কুরবানী হচ্ছে ইবাদত । আর ইবাদত আল্লাহ ছাড়া কারা
জন্য করা জায়েজ নয় । মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
“আপনি
বলুনঃ আমার নামায, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর
জন্যই । তাঁর কোন অংশিদার নেই । আমি তা-ই করতে আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম আনুগত্যশীল
(সূরা আনআম-১৬২-১৬৩)
সূরা কাউসারে মহান রাব্বুর আলামীন বলেন- অতএব
আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন (সূরা কাউসার-২)
“নিশ্চয়ই আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি ও তোমারই
নিকট সাহায্য চাই।” (সুরা ফাতিহাঃ ৫)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “কোন
কিছু চাওয়ার হলে আল্লাহর কাছে চাইবে এবং সাহায্য চাইলে একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য
চাইবে ।” (তিরমিযী)
“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের জন্য মানত করে সে যেন
তা পূর্ণ করে, আর যে তার বিরুদ্ধে পাপাচরণে মানত করে সে যেন তা হতে বিরত থাকে” (বুখারী)
সুতরাং পীরের নামে ও মাযারের নামে মান্নত করা কি শিরকী
কর্ম নয় ?
বিশিষ্ট সাহাবী জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরে চুন কাম করা, তার উপর বসা এবং তার উপর
বিল্ডিং নির্মান করতে নিষেধ করেছেন (সিহীহ্ মুসলিম, অধ্যায়ঃ জানাযা, অনুচ্ছেদঃ কবরকে
পাকা করা ও চুনকাম করা নিষেধ হা/১৬১০)
তারা বলে থাকেন আমরা সৌন্দর্য প্রকাশ ও কবরকে হেফাযতের
জন্য এ গুলো করে থাকি । জেনে রাখুন সোন্দর্য প্রকাশের জন্য হোক, মানুষকে আকৃষ্ট করার
জন্য হোক কিংবা হেফাযতের জন্য হোক, তা শরীয়তে জঘন্যতম বিদআত । এ গুলো করার পিছনে কোন
দলীল নেই ।
রাসূল (ছাঃ) কবর উঁচু করতে, পাকা করতে, তার উপর সৌধ
নির্মাণ করতে ও বসতে নিষেধ করেছেন (মুসলিম, মিশকাত হা/১৬৯৬-৯৭)
এর একটি উজ্জল উদাহরণ হল, আবুল হায়্যাজ আল আসাদী থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ) বললেন,
আমি কি তোমাকে এমন মিশন দিয়ে পাঠাবো না, রাসূলুল্লাহ্
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে যে মিশন দিয়ে পাঠিয়েছিলেন ? আর তা ছিল,
কোন মূর্তী পেলে তা ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে, কোন উঁচু কবর পেলে ভেঙ্গে তা মাটি বরাবর
করে দিবে ।” অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ “এবং কোন ছবি পেলে তা মিটিয়ে ফেলবে” (সহীহ্
মুসলিম, অধ্যায়ঃ জানাযা, অনুচ্ছেদঃ কবরকে ভেঙ্গে মাটি বরাবর করা হা/ ১৬০৯)
ইসলাম পূর্ব লোকেরা তাদের নবীদের কবরকে মাসজিদ বানিয়ে
নিয়ে সেখানে ইবাদত করত ।
এ কথা হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
পরিস্কার ভাবে বলে দিয়েছেনঃ “জেনে রাখা উচিৎ যে, তোমাদের পূর্বের লোকেরা তাদের নবীদের
কবরসমূহকে মাসজিদে পরিণত করত । সাবধান ! তোমরা কবরগুলোকে মাসজিদে পরিণত কর না । আমি
তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছি” (মুসলিম)
কবরকে মাসজিদে পরিণত করার অর্থ হল কবরের কাছে নামায
আদায় করা । যদিও তার উপর মাসজিদ নির্মাণ করা হয়নি । মূলতঃ নামাযের জন্য কোন স্থানে
গমণ করাই উক্ত স্থানকে মাসজিদে রূপান্তরিত করার শামিল ।
কাল্পনিক কারামত
অনেক মানুষই মুজিযা আর কারামতের পার্থক্য জানে না ।
মুজিযা প্রকাশের শর্ত হল নবী বা রাসূল হওয়া । আর কারামত প্রকাশের শর্ত হল নেককার ও
মুত্তাকী হওয়া ।
অতএব যদি কোন বিদআতী পীর-ফকির বা শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিদের
থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পায় সেটা মুজিযাও নয়, কারামতও নয় । সেটা হল দাজ্জালী ধোকা-বাজি
বা প্রতারণা ।
অদৃশ্য জগতের চাবিগুলো (ভান্ডারগুলো) আল্লাহরই নিকট
। তিনি ব্যতীত তা কেউ-ই জানে না (নামল আয়াত ৬৫)
আর অদৃশ্যের চাবি তাঁরই নিকটে রয়েছে । তিনি ব্যতীত
অন্য কেউ তা জানে না । স্থলে ও সমুদ্রভাগে যা কিছু আছে তা তিনিই জানেন (আন-আম আয়াত
৫৯)
তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী পরন্ত তিনি অদৃশ্য বিষয় কারও
কাছে প্রকাশ করেন না (জিন আয়াত ২৬)
আল্লাহ ব্যতীত নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের কেউ গায়েবের খবর
জানে না (নামল আয়াত ৬৫)
আল্লাহ তাআলা বলেন: কোন মানুষের জন্য সংগত নয় যে,
আল্লাহ তাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করার পর সে মানুষকে বলবে, তোমরা আল্লাহকে
ছেড়ে আমার ইবাদতকারী হয়ে যাও । বরং সে বলবে, তোমরা রব্বানী (আল্লাহ ভক্ত) হও । যেহেতু
তোমরা কিতাব শিক্ষা দিতে এবং তা অধ্যয়ন করতে । আর তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ করেন না
যে, তোমরা ফেরেশতা ও নবীদেরকে প্রভূ রূপে গ্রহণ কর । তোমরা মুসলিম হওয়ার পর তিনি কি
তোমাদেরকে কুফরীর নির্দেশ দেবেন ? (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৭৯-৮০)
মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কারণেই তারা অলী-বুযুর্গদের
কবরে মানত করে, কবর প্রদক্ষিণ করে, কবর সজ্জিত করে, কবরে ওরস অনুষ্ঠান করে । কবরবাসীর
কাছে তারা সাহায্য চায়, উদ্ধার কামনা করে । যদি কবরওয়ালার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান
ও ভালোবাসা না থাকতো, তাহলে তারা এগুলোর কিছুই করত না । আর এ ধরনের ভালোবাসা শুধু আল্লাহর
তাআলার জন্যই নিবেদন করতে হয় । আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য নিবেদন করা শিরক ।
আল্লাহ তাআলা বলেন: আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা
আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহকে ভালবাসার মত তাদেরকে ভালবাসে
। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর । (সূরা আল বাকারা, আয়াত
১৬৫)
যখন একমাত্র আল্লাহর আলোচনা হয় তখন যারা পরকালে বিশ্বাস
করে না তাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে যায় । আর যখন আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের (ভন্ড বুজুর্গদের)
আলোচনা হয় তখন তারা আনন্দে উল্লাসিত হয়ে উঠে (যুমার আয়াত ৪৫)
পীরেরা কি গায়েবীভাবে মুরীদদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার
করতে পারেন?
পীর সাহেব হযরত রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী সাহেবের একটি কারামাত
লিখেছেনঃ ঘটনাটি সংক্ষেপে এরূপঃ দেওবন্দ মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা আহমদ হোছায়েন
সাহেব হজ্জ থেকে ফেরার পথে তাদের ষ্টীমার সাগরের মধ্যে ভয়ানক তুফানের মধ্যে পতিত হয়
। ষ্টীমার লাইন ছেড়ে ২০০ মাইল অন্য দিকে সরে যায় । তখন হাজী সাহেবগণ খুরমা, সুরমা,
রুমাল ইত্যাদি মক্কা শরীফ থেকে যা নিয়ে এসেছিলেন তা সামনে রেখে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন,
ওগো আমার মাওলা ! আমাদের প্রাণের টুকরা ছেলেমেয়ে আপনার নাবালেগ বেগুনাহ্ বান্দাদের
জন্যই আমরা এইসব আনিয়াছি, তাহাদের উছীলায় আমরা গুনাহগার বান্দাদিগকে এই মহাসংকট হইতে
বাঁচাইয়া রাখুন ।
হযরত মাওলানা সাহেব (দেওবন্দের মোহতামিম) বলেন, “সে
সময় আমার চোখে একটু তন্দ্রা আসিল । ঐ তন্দ্রার মধ্যে দেখিতে পাইলাম যে, কুতুবে আলম
হযরত গঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহে একখানা ছোট নৌকার উপর বসিয়া আমাদের ষ্টীমারখানা
কাঁধের সঙ্গে লাগাইয়া ধরিয়ে রাখিয়াছেন । আমার তন্দ্রা ভাঙ্গিয়া গেল । আমি হাজী
সাহেবদের বলিলাম কোন চিন্তা নেই আমাদের বাঁচাইবার জন্যে আল্লাহ্ পাক মেহেরবানী করিয়া
তাহার কুতুব পাঠাইয়া দিয়াছেন”
পীর সাহেব ঘটনার সারাংশে লিখেছেনঃ “এখন লক্ষ্য করুন
মাওলার খাঁটি আশেক হইতে পারিলে তিনি আপন আশেককে কতদূর মর্তবা ও কি পরিমাণ ক্ষমতা দান
করিয়া থাকেন । আরো লক্ষ্য করুন যে, দুনিয়াতে যাহাকে এত শক্তি দান করিয়াছেন, আখেরাতে
যে তাঁহাকে কত শক্তি, কত মর্তবা দিবেন তাহার কোন সীমা থাকিবে না” (আশেক মাশুক বা এস্কে
এলাহীঃ ৬০-৬১ পৃষ্ঠা)
আরেকটি ঘটনাঃ
পীর সাহেব হযরত গঙ্গুহী সাহবের আরেকটি কারামাত লিখেছেনঃ
“জনৈক বৃদ্ধের এক ছেলে তিনদিন যাবত নিরুদ্দেশ ছিল । বৃদ্ধ ছেলেকে উদ্ধারের জন্য গঙ্গুহী
সাহেবের নিকট দরখাস্ত করলেন । তখন গঙ্গুহী সাহেব মুরাকাবায় বসে বৃদ্ধের ছেলেকে উদ্ধার
করে দিলেন এবং তাকে বললেন, বাড়ি যাও, তোমার ছেলে বাড়ি আসিয়াছে । (আশেক মাশুক বা
এস্কে এলাহীঃ ৬২-৬৩ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ বলেনঃ “সমুদ্রবক্ষে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ
করে তখন কেবলমাত্র আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমরা আহ্বান করে থাক তাদের কথা তোমাদের মন
থেকে সরে যায় (যেহেতু এই বিপদের মুহূর্তে ওরা এখন কোন উপকারে আসবে না) কিন্তু তিনি
স্থলভাগে তোমাদেরকে পৌঁছে দিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার করে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও
। আসলে মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৬৭)
আল্লাহ্ বলেনঃ “তারা যখন নৌযানে আরোহণ করত, তখন বিশুদ্ধচিত্তে
একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকত; অতঃপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করতেন, তখন
তারা শির্কে লিপ্ত হত” (সূরা আনকাবূতঃ ৬৫)
হানাফী মাযহাবের আলেম শায়খুল কুরআন শায়খ গোলাম (রহঃ)
(মৃত্যু ১৯৮০ খৃঃ) বলেন: “উল্লেখিত আয়াত সমূহ দ্বারা পরিস্কার হয়ে গেল যে, মক্কার
মুশরিকরা বিপদ-মুসীবতের সময় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো স্মরণাপন্ন হতো না । তারপরও
তারা ছিল মুশরিক । কেননা তারা অন্য সময় গাইরুল্লাহর স্মরণাপন্ন হত । কিন্তু বর্তমান
যুগের পীরপন্থীরা মক্কার মুশরিকদেরকে টেক্কা দিয়ে সীমালঙ্ঘন করেছে । তারা সধারণ সময়ে
তো অবশ্যই এমনকি বিপদাপদের মুহূর্তেও আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পীর-মাশায়েখ, কুতুবদেরকে
ডেকে থাকে, তাদের কাছে সাহায্যের প্রার্থনা জানায় । বলেঃ আমাদের স্টীমার সমুদ্রে বিপদম্মুখ
হয়েছে, হে আল্লাহর ওলী আমাদের সাহায্য করুন..।” (জুহূদুল উলামা আল হানাফিয়্যাহ্ ফী
ইবতালি আকায়েদিল কুবুরিয়্যা ; কবর পুজারী পীরপন্থীদের ভ্রান্ত আকীদা মূলৎপাটনে হানাফী
আলেমদের প্রচেষ্টা লেখকঃ ডঃ শামসুদ্দীন আফগানী (রহঃ) ২/১১৮৮ পৃঃ)
হায় আফসোস ! মক্কার কাফেররা নৌকা-স্টীমারে বিপদের
সময় তাদের পালনকর্তা আল্লাহকে চিনল, কিন্তু বর্তমান যুগের মুসলমানরা ঠিক ঐ ধরণের বিপদে
প্রকৃত উদ্ধারকারী আল্লাহকে চিনল না, চিনল কুতুব ও ওলী-আউলিয়াদেরকে ! যারা অন্যের
উপকার তো দূরের কথা নিজেরা নিজেদের উপকার সাধন বা ক্ষতি রোধের বিন্দুমাত্র ক্ষমতা রাখেন
না !
আল্লাহ্ ছাড়া কেউ বিপদাপদ দূর করতে সক্ষম নয়ঃ
আল্লাহ্ বলেনঃ “আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহ্ ব্যতীত
যাদের কাছে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার ধারণায় তাদেরকে ডেকে থাক, তারা তো তোমাদের বিপদাপদ
দূর করার ক্ষমতা রাখে না এবং (তাতে সামান্যতম) পরিবর্তন করারও কোন শক্তি তাদের নেই
। যাদেরকে তারা ডেকে থাকে তারা নিজেরাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় অনুসন্ধান
করে বেড়ায় যে, তাদের মধ্যে কে কত আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে । তাঁরা আল্লাহর দয়া
প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৫৬-৫৭)
এরশাদ করেনঃ “আল্লাহ যদি আপনাকে কোন বিপদে ফেলেন, তবে
তা থেকে তিনি ছাড়া উদ্ধার করার ক্ষমতা কেউ রাখে না” (সূরা আনআমঃ ১৭, ইউনুসঃ ১০৭)
আল্লাহ্ আরো বলেনঃ “আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহকে
বাদ দিয়ে অন্যকে ওলী হিসেবে গ্রহণ করবে ? ওরা তো নিজেদেরই না উপকার করার ক্ষমতা রাখে
না কোন ক্ষতি করার সামর্থ রাখে” (সূরা রাদঃ ১৬)
আল্লাহ্ আরো বলেনঃ “আপনি বলে দিন, আল্লাহ্ যদি তোমাদের
ক্ষতি করার ইচ্ছা করে অথবা তোমাদের উপকার করার ইচ্ছা করেন, তবে কে আল্লাহর ইচ্ছাকে
রুখে দেয়ার ক্ষমতা রাখে ?” (সূরা ফাতাহ্ : ১১)
আল্লাহ্ আরো বলেন, “ওরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে মাবূদ
গ্রহণ করেছে । অথচ ঐ মাবূদরা কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না; বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা
হয়েছে । ওরা নিজেদের কোন ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা রাখে না । কাউকে মৃত্যু দেয়া, জীবন
দেয়া এবং কারো পুনরুত্থানের মালিক নয়” (সূরা ফুরকানঃ ৩)
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের ভাল-মন্দের
মালিক ননঃ
আল্লাহ্ বলে দিয়েছেনঃ “(হে রাসূল!) আপনি বলে দিন,
আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমি আমার নিজের আত্মার ভাল-মন্দ, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি
বিষয়ে আমার কোন অধিকার নেই । আমি যদি গায়েবী বিষয়ের খবর জানতাম তবে আমি অনেক কল্যাণ
লাভ করতে পারতাম, আর কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারত না । (অতএব আমি গায়েবের
কোন খবরই রাখি না) আমি শুধু মুমিন সমপ্রদায়ের জন্যে একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদবাহী”
(সূরা আরাফঃ ১৮৮)
আল্লাহ কোরআনে বলেছেন সূরা আহকাফ-৯> হে নবী, বল,
আমি জানি না আমার সাথে আল্লাহ কি ব্যবহার করবেন এবং আমি জানি না আল্লাহ তোমাদের সাথে
কি ব্যবহার করবেন ।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মতেরও ভাল-মন্দের
মালিক ননঃ
আল্লাহ্ তাঁকে কুরআন নাযিল করে আশ্বস্থ করেছেনঃ “আপনি
কাউকে ভালবাসলেই তাকে হেদায়াত করতে পারেন না । কিন্তু আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত
করতে পারেন । হেদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে তিনি অধিক জ্ঞান রাখেন” (সূরাঃ কাসাসঃ ৫৬)
আল্লাহ্ তাআলা এরশাদ করেনঃ “আপনি বলে দিন, আমি তোমাদের
কারো জন্যে কোন ধরণের অনিষ্টের এবং কল্যাণের মালিক নই” (সূরা জিনঃ ২১)
আরেকটি ঘটনাঃ
পীর সাহেব আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেনঃ হযরত শামছুত
তাবরিজী (রঃ) একদা রোম শহরের দিকে রাওয়ানা হলেন । পথিমধ্যে জনৈক অন্ধ বৃদ্ধকে একটি
লাশ সম্মুখে নিয়া কাঁদিতে দেখলেন । কারণ জিজ্ঞেস করিলে বৃদ্ধ বলিল, আমার কেউ নেই,
১২ বছর বয়স্ক এটা আমার নাতী গাভী পালিয়া আমাকে দুগ্ধ খাওয়াইত এবং আমার খেদমত করিত
। এখন আমার কোন উপায় নাই তাই কাঁদিতেছি । তখন হুজুর (তাবরিজী) বলিলেন, হে ছেলে, তুমি
আমার হুকুমে দাঁড়াও । তখনই ছেলেটি উঠিয়া দাঁড়াইল । তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল কিরূপে
জীবিত হইলে ? নাতি বলিল, আল্লাহর ওলী আমাকে জেন্দা করিয়াছেন । এ খবর খাঁটি মুসলমান
বাদশার কাছে পৌঁছিলে তিনি কুতুবকে ডেকে বললেনঃ যদি আল্লাহর আদেশে জেন্দা হইতে বলিতেন
। কুতুব সাহেব উত্তর করিলেন, মাবুদের কাছে আবার কি জিজ্ঞাসা করিব- তাঁহার আন্দাজ নাই
? এই বৃদ্ধের একটি মাত্র পুত্র ছিল তাহাও নিয়াছে । বাকী ছিল এই নাতিটি, যে গাভী পালন
করিয়া কোনরূপে জিন্দেগী গুজরান করিত, এখন এটিও নিয়া গেল । তাই আমি আল্লাহ্ পাকের
দরবার থেকে জোরপূর্বক রূহ নিয়া আসিয়াছি...।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়ঃ
বাদশাহ্ তাবরিজী সাহেবকে বলিলেন, আপনি শরীয়ত মানেন
কিনা ? তিনি বলিলেনঃ নিশ্চয়, শরীয়ত না মানিলে ভীষণ কিয়ামতের দিন হুজুর ছাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত পাওয়া যাইবেনা । বাদশা বলিলেন, আপনি শেরেক করিয়াছেন,
সেই অপরাধে আপনার শরীরের সমস্ত চামড়া খসাইয়া ফেলিতে হইবে । আল্লাহর কুতুব কথা শুনা
মাত্র দুই হাতের আঙ্গুলি দ্বারা পায়ের নীচ থেকে আরম্ভ করিয়া গায়ের সমস্ত চামড়া
খসাইয়া বাদশাহর সম্মুখে ফেলিয়া জঙ্গলে চলিয়া গেলেন । জঙ্গলে বসিয়া আল্লাহর জেকেরে
মশগুল হইয়া গেলেন । ভোর বেলা সূর্যের তাপ চর্মহীন শরীরে লাগা মাত্র কষ্ট পাইলেন এবং
সূর্যকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে সূর্য্য আমি শরীয়ত মানিয়াছি, কাজেই তুমি আমাকে
কষ্ট দিওনা । ইহা বলা মাত্র ঐ দেশের জন্য সূর্য্য অন্ধকার হইয়া গেল । দেশের ভিতর একটা
সোরগোল পড়িয়া গেল । বাদশাহ্ অস্থির হইয়া ঐ হুজুরকে তালাশ করিতে লাগিলেন । বহু চেষ্টার
পর এক জঙ্গলে গিয়া তাহার সাক্ষাৎ পাইলেন এবং আরজ করিলেন হুজুর শরীয়ত জারী করিতে গিয়া
আমরা কি অন্যায় করিলাম, যাহার জন্য আমাদের এই মুসীবত আনিয়া দিয়াছেন ? হুজুর তখন
সূর্য্যকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে সূর্য্য তোমাকে বলিয়াছি আমাকে কষ্ট দিওনা, কিন্ত
দেশবাসীকে কষ্ট দেও কেন ? ইহা বলা মাত্র সূর্য্য আলোকিত হইয়া গেল । আল্লাহ্ পাক তাহার
ওলীর শরীর ভাল করিয়া দিলেন ।
পীর সাহেব উক্ত ঘটনা উল্লেখ করে টিকায় লিখেছেনঃ
এধরনের কথা বলা আমাদের মত সাধারণ লোকদের জন্য পরিস্কার
কুফুরি বলিয়া গণ্য হইবে । কিন্তু আল্লাহ্ পাকের দেওয়ানা বান্দাগণ এশ্কের চরম হালতে
অন্তরের ভারসাম্য হারাইয়া একপ্রকার বেহুশ অবস্থায় কদাচিৎ এরূপ বলিয়া ফেলেন । আল্লাহ্
পাকের আশেকদের এধরনের ঊক্তি এশকের জোশ বশতঃ ঘটিয়া যায়, তাই আল্লাহ্ পাকের নিকট তাহা
অপরাধ বলিয়া গণ্য হয়না । যেরূপ শিশু যদি পিতার মুখে থাপ্পড় মারে কিংবা দাড়ি ছিড়িয়া
ফেলে, পিতার নিকট তাহা পীড়াদায়ক হয়না বরং তাহাতে আরো মহব্বতের জোয়ার উঠে । [দ্রঃ
ভেদে মা'রেফত বা ইয়াদে খোদাঃ ১৫-১৭ নং পৃষ্ঠা]
ক) মারেফতের পীররা মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন
!
কিন্তু ইসলাম কী বলে ? মানুষকে জীবন দেয়া ও মৃত্যু
দেয়া একমাত্র আল্লাহরই কাজ । তিনিই জীবন-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন (দ্রঃ সূরা মুলকঃ ২নং
আয়াত)
আল্লাহ্ সত্যই বলেছেনঃ “ওরা যদি সত্যিকার ভাবে আল্লাহ্,
নবী এবং তাঁর নিকট যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান রাখত, তবে তাদেরকে ওলী হিসেবে গ্রহণ
করত না । কিন্তু তাদের অনেক লোকই ফাসেক” (সূরা মায়েদাঃ ৮১)
খ) সূর্য-চন্দ্র মারেফতী পীরদের কথা শুনে থাকে !
সূর্য-চন্দ্র ইত্যাদি আল্লাহর আজ্ঞাবহ, কোন মানুষের
আজ্ঞাবহ নয় । এগুলো আল্লাহর বড় বড় নিদর্শন ।
আল্লাহ্ বলেনঃ “এবং তাঁর নিদর্শন সমূহের মধ্যে রয়েছে-
দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র” (সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ্ : ৩৭)
“তোমরা কি লক্ষ্য করো না যে, কিভাবে আল্লাহ্ সপ্ত
আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন । এবং সেখানে চন্দ্রকে করেছেন আলো স্বরুপ ও এবং সূর্যকে
করেছেন প্রদীপ স্বরুপ (সূরা নূহঃ ১৬-১৭)
সূর্য-চন্দ্রসহ পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহকে সিজদা করে
থাকে । আল্লাহ্ বলেনঃ
“আপনি কি দেখেন না, আকাশ সমূহে যা কিছু আছে এবং পৃথিবীতে
যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহকে সিজদা করে, আল্লাহকে আরো সিজদা করে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র,
পাহাড়, বৃক্ষ, প্রাণীকুল এবং অনেক মানুষ..” (সূরা হাজ্জঃ ১৮)
এই সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্র আল্লাহর নির্দেশে চলে । আল্লাহর
নির্দেশেই তাদের গতি থেমে যাবে, তাদের আলো নিভে যাবে ।
আল্লাহ্ বলেনঃ “যখন সূর্য আলোহীন হয়ে পড়বে, যখন
নক্ষত্র মলিন হয়ে যাবে...” (সূরা তাকভীরঃ ১-২) সন্দেহ নেই যে কিয়ামতের সময়ই চন্দ্র-সূর্যের
এই অবস্থা হবে, তার পূর্বে নয় ।
গ) মারেফতের পীরগণ বাহ্যিকভাবে ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান
মানতে বাধ্য নন !
ঘ) আল্লাহর শানে বেয়াদবী মূলক কথা মুখে উচ্চারণ করলেও
মারেফতের পীরদের কোন অপরাধ নেই !
আল্লাহ্ বলেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের
অন্বেষণ করবে তার থেকে তা গ্রহণ করা হবে না । আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভূক্ত
হবে” (সূরা আলে ইমরানঃ ৮৫)
মারেফতের পীর-ওলীদের মর্যাদা নবীদের চেয়েও বেশী !
পীর সাহেব লিখেছেনঃ “হে মুমিন ভাই সকল ! এখন বুঝিয়া
লউন যে, মূর্খ লোক মা'রেফতের উপরের দরজায় পৌঁছতে পারে কিনা এবং ইহাও খেয়াল করুন যে,
মা'রেফতের রাস্তা কত বড় কঠিন ও কত গোপন, যেখানে মূছা (আঃ) এর মত অত বড় পয়গাম্বরও
একজন সাধারণ রাখালের হাল বুঝিতে পারেন নাই” (আশেক মাশুক ৮৮-৯০ পৃঃ)
পীর সাহেব উল্লেখিত উক্তি দ্বারা পরোক্ষভাবে মানুষকে
নবী-রাসূলদের অনুসরণ থেকে বিরত রেখে মা'রেফতের পীরদের অনুসরণের প্রতি আহ্বান করেছেন
।
আমরা জানি معرفة (মা'রেফত) শব্দটি আরবী,
তার অর্থ চেনা বা জানা । একজন মানুষ কোন বিষয় সম্পর্কে জানলে বা চিনলে তার মা'রেফত
হাসিল হল । আল্লাহকে চেনা ও জানার জন্য তাঁর প্রদত্ব কিতাব ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাত ব্যতীত তৃতীয় কোন রাস্তা নেই । এজন্যেই
ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেনঃ “ইবনে আরাবী তার রচিত
ফুসুস নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ “আল্লাহর ওলীগণ কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর নিকট
থেকে নির্দেশ পান । আর নবীগণ ফেরেশতার মাধ্যমে নির্দেশনা লাভ করে থাকেন ।” তার এই কথা
মিথ্যা ও বাতিল । কেননা কোন ওলী আল্লাহর নির্দেশনা লাভ করতে পারেন না, তাঁর কাছে প্রেরীত
নবী-রাসূলের মাধ্যম ছাড়া । অবশ্য ওলীর কাছে যদি কোন বিষয়ে এলহাম হয়, তবে তা ভিন্ন
কথা । কিন্তু সেই এলহামের সত্যতা যাচাই করতে হবে কুরআন-সুন্নাহর মাপকাঠিতে” (মাজমু’
ফাতাওয়াঃ ১/১৪৯)
আল্লাহ্ বলেনঃ “কোন মানুষের এমন মর্যাদা নেই যে, ওহীর
মাধ্যমে কিংবা পর্দার অন্তরালে অথবা দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে আল্লাহ্ তার সাথে সরাসরি
কথা বলবেন । তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁরই অনুমতিক্রমে দূত (জিবরীল বা অন্য ফেরেশতা) ওহী
আনয়ন করে থাকেন । নিশ্চয় তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়” (সূরা শূরাঃ ৫১)
ইমাম ইবনে হাজার হায়তামী (রহঃ) বলেন, কোন মানুষ যদি
ধারণা করে যে, অন্তরের বিশুদ্ধতার মাধ্যমে নবুওতের সম্মান লাভ করা যায়, অথবা বিশ্বাস
করে যে, কোন কোন ওলী নবী থেকে উত্তম, অথবা বলে যে তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশনা
এসে থাকে- যদিও সে নবুওতের দাবী না করে, তবে এ ব্যক্তি কাফের ও মুরতাদ হিসেবে গণ্য
হবে । মুসলিম শাসকের উপর ওয়াজিব হচ্ছে তাকে হত্যা করা (আল যাওয়াজের আন ইক্বতিরাফিল
কাবায়ের ১/৬৬ পৃঃ)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ ইমাম গাজালী (রহঃ) সুস্পষ্টরূপে
একথা উল্লেখ করেছেন যে, কোন মানুষ যদি নবুওতের মর্তবার উপরে বেলায়াতের মর্তবাকে উচ্চ
দাবী করে, তবে তাকে হত্যা করা আমার নিকট একশত কাফেরকে হত্যা করার চাইতে অধিক পছন্দনীয়
। কেননা এই ব্যক্তি দ্বারা দ্বীনের ভয়ানক ক্ষতি সাধিত হবে (মাজমু ফাতাওয়া ৪/১০৪ পৃঃ)
প্রশ্নঃ কোন ভবিষ্যৎ বর্ণনাকারী পীরের কথা কি বিশ্বাস
করা যায় ?
উত্তরঃ না, কোন পীরের ভবিষ্যৎবাণী বিশ্বাস করা শিরক
।
কুরআনের দলীলঃ “(হে নবী) বলুনঃ আসমান ও জমীনের গায়িবের
খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানের না ।” (সুরা নামলঃ ৬৫)
হাদীসের দলীলঃ “যে ব্যক্তি কোন গণক বা ভবিষ্যৎ বর্ণনাকারী
ব্যক্তির নিকট গমন করে এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, তবে সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাকে যেন অস্বীকার করল”(সহীহ্, আহমদ)
প্রশ্নঃ আল্লাহ ও নবী রাসুল ছাড়া অন্য কেউ কি কোন
ব্যাক্তিকে জান্নাতি বলতে পারে ?
উত্তরঃ আল্লাহ কোরআনে বলেছেন সূরা আহকাফ-৯> হে নবী,
বল, আমি জানি না আমার সাথে আল্লাহ কি ব্যবহার করবেন এবং আমি জানি না আল্লাহ তোমাদের
সাথে কি ব্যবহার করবেন ।
বুঝার চেষ্টা করুন, নবী নিজেই যেখানে জানেন না তার
সাথে কি ব্যবহার হবে, সেখানে আমাদের দেশের ৯০% মানুষ মনে করে আব্দুল কাদের জিলানী,
শাহ জালাল, শাহ পরান (রহঃ) জান্নাতি । তারা জান্নাতের সার্টিফিকেটই দিয়া দেয় ।
অনেকে তাদের মুখে জান্নাতি না বললেও মনে মনে সেটা বিশ্বাস
করে । আর ঈমান হলো সেটাই যা অন্তরে বিশ্বাস করা হয়, মুখে স্বীকার করা হয় এবং কার্য
দ্বারা সম্পাদন করা হয় ।
কবরপুজারী, মাজারপুজারীরা মুখে অস্বীকার করলেও তাদের
অন্তর এই স্বাক্ষ্যই দেয় যে তাদের মাযারে শায়িত বুজুর্গ জান্নাতি ।
আল্লাহ এই পীর পুজারী, কবর পুজারীদের হেদায়েত দান
করুন । আমীন ।
প্রশ্নঃ পীর, মাযারকে সিজদা করা কি যায়েজ ?
পীরগণ ও তাদের মুরিদগণ কোরআন থেকে দলিল দেন যে আদম
আ: কে সিজদাহ করতে বলা হইছিল ফেরেশতাদের । কারণ কি ? কারণ তিনি তাদের চেয়ে বেশী জ্ঞান
সম্পন্ন ছিলেন । পাশাপাশি আদম আ: ও ফেরেশতাদের মধ্যে জ্ঞান এর প্রতিযোগীতায় তিনি জয়লাভ
করেছিলেন ।
তো আদম আ: এর যদি জ্ঞান বেশী থাকার কারণে ফেরেশতারা
তাকে সিজদাহ করে । তাহলে পীরের জ্ঞান বেশী থাকার কারণে কেন মুরীদরা তার সিজদাহ করতে
পারবে না ?
শয়তান যেহেতু আদম আ: কে সিজদাহ করেনি, তাই সে জাহান্নামী
। তেমনি বর্তমানে যে পীরদের সিজদাহ করবে না তারাও শয়তান, জাহান্নামী । নাউযুবিল্লাহ
তাদের এই দলিল এক কথাতেই খন্ডন করা যায় যে,
জ্ঞান বেশী থাকার কারণে যদি কাউকে সিজদা করা যেত তাহলে
বিশ্ব নবী, সর্বশেষ ও চুড়ান্ত নবী, আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী মোহাম্মদ সা: ছিলেন সেই
সিজদাহ পাওয়ার সর্বপ্রথম দাবীদার এবং সবচেয়ে যোগ্য । সকল পীরের থেকেও যোগ্য ।
কিন্তু সাহাবাগণ কি তাকে সিজদাহ করেছিলেন ?
মহানবী সা: কি তাদের সিজদাহ করতে বলেছিলেন তাকে । নাকি
এক আল্লাহকে ?
আল্লাহ ছাড়া কাউকে সেজদা করা সুষ্পষ্ট হারাম । কুরআনের
অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে নববী দ্বারা যা দিবালোকের ন্যয় পরিস্কার । একথা মনে হয় অন্ধ পীর
ও মাজারপূজারী ছাড়া সকল মুসলমানরাই জানে ।
প্রশ্নঃ: যারা মা‘রেফতী আক্বীদায় বিশ্বাস করে, মাযার
ও কবর পূজা করে, ছালাত ও ছিয়ামের ধার ধারে না তাদের জানাযায় শরীক হওয়া যাবে কি
?
উত্তর : মা‘রেফতী আক্বীদা বলতে শরী‘আতে ভিন্ন কোন আক্বীদা
নেই । যারা ইসলামকে শরী‘আত, মা‘রেফত, তরীকত, হাকীকত ইত্যাদি বলে ভাগ করেছে তারা মনগড়া
দ্বীনের তাবেদারী করে । অথচ আল্লাহর নিকট মনোনীত দ্বীন শুধু ইসলাম (আলে ইমরান ১৯) ।
ইচ্ছা করে ছালাত ত্যাগ করা কুফরী কাজ (মুসলিম হা/১৩৪)
।
আর যারা ছালাত ছিয়ামের ধার ধারে না তারা ইসলাম থেকে
দূরে । তাদের জানাযায় শরীক হওয়ার প্রশ্নই আসে না ।
আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, যারা কুফরী অবস্থায় মারা
যাবে আপনি তাদের জানাযা পড়াবেন না (তওবা ৮৪)
প্রশ্ন: কোন রোগের কারণে গাছের শিকড় বা কোন গাছড়া
মাদুলীর মধ্যে ঢুকিয়ে ব্যবহার করা যাবে কি ?
উত্তর: মাদুলী হচ্ছে তাবীয । আর যেকোন ধরনের তাবীয
ব্যবহার করা শিরক ।
রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তাবীয লটকালো সে শিরক
করল (আহমাদ হা/১৬৯৬৯, সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৪৯২; তিরমিযী হা/২০৭২, সনদ হাসান)
প্রশ্ন: আমরা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার উপর কোন
পীর, ইমাম, আউলিয়া বা মণিষীদের কথাকে অথবা তাদের রচিত বই পুস্তককে প্রাধান্য দিব
?
উত্তরঃ না, অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার উপর
এক বিন্দু পরিমাণ কাউকে প্রাধান্য দেয়া জায়িয নয়, বরং আল্লাহর হুকুমের সম্পূর্ণ
পরিপন্থি ।
কুরআনের দলীলঃ “হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
উপর কাউকে প্রাধান্য দিবে না”(সুরা হুজরাতঃ ১)
হাদীসের দলীলঃ “আল্লাহর বিরুদ্ধাচারণের কারো কোন আনুগত্য
চলবেনা । একমাত্র ভাল কাজেই আনুগত্য চলবে”(বুখারী ও মুসলিম)
উল্লেখিত কুরআন ও হাদিসের বিবরণ মোতাবিক আমরা সহজেই
অনুমান করে নিতে পারি আমাদের দেশের ভন্ড মাযারপূজারী ও কবরপূজারীরা
কি পরিমাণ শিরকী কর্মকান্ডে লিপ্ত । তাই জ্ঞান লাভের বা সত্য আসার পরপরই এসব পীরপুজা,
মাযারপুজা, পীর সিজদাহ ছাড়ার আহবান রইল । আমাদের দায়িত্ব কেবল সত্য বিষয়টি আপনাদের
কাছে পৌঁছে দেয়া ।
হে ঈমানদারগণ ! অধিকাংশ আলেম ও দরবেশদের অবস্থা এই
যে তারা জনগনের ধনমাল বাতিল পন্থায় ভক্ষণ করে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে ফিরিয়ে রাখে
(তওবা আয়াত ৩৪);
সঠিক ইসলামিক এসে সহিহ আক্বীদাহ’র উপর ইবাদত বন্দেগী
করুনঃ-
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘মূসা (আঃ)-এর উম্মত ৭২
দলে বিভক্ত হয়েছিল আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে । তন্মধ্যে একটি মাত্র দল জান্নাতে
যাবে । ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, সে জান্নাতী দল কোনটি ? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আমি
ও আমার ছাহাবীগণ যে মত ও পথের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি, সেই মত ও পথের উপর যারা প্রতিষ্ঠিত
থাকবে, তারাই জান্নাতী দল’ {আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৭১}
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় মিরকাত শরীফে আরো উল্লেখ
আছে যে,
"জেনে রাখ ! (উক্ত ৭৩টি দল) প্রধানতঃ ৮টি দলে
বিভক্ত যা "মাওয়াক্বিফ" কিতাবে বর্ণিত রয়েছে- (১) মু'তাযিলাহ---এরা ২০
দলে বিভক্ত (২) শিয়া---এরা ২২ দলে বিভক্ত (৩) খারেজী---এরা ২০ দলে বিভক্ত (৪) মরজিয়্যাহ---এরা
৫ দলে বিভক্ত (৫) নাজ্জারিয়্যাহ---এরা ৩ দলে বিভক্ত (৬) জাবারিয়্যাহ---এরা ১ দলে
বিভক্ত (৭) মুশাব্বিহা---এরা ১ দলে বিভক্ত উল্লেখিত ৭২টি দল, তারা প্রত্যেকেই জাহান্নামী
। (৮) নাজিয়্যাহ---এরা ১ দলে বিভক্ত আর নাজিয়্যাহ হল-সাইয়িদুল মুরসালীন, ইমামুল
মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্পষ্ট সুন্নত ও উজ্জ্বল
তরীক্বতের অনুসারী"
হযরত আব্দুল কাদির জ্বীলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর
আলোড়ন সৃষ্টিকারী গুনিয়াতুত্ তালেবীন কিতাবের ১৯৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন,
"(হাদীস শরীফে বর্ণিত) ৭৩টি দল মুলতঃ ১০টি মুল
দলের অন্তর্ভুক্ত যার বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপঃ (১)আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত---এরা
১ দলে বিভক্ত (২) খারেজী---এরা ১৫ দলে বিভক্ত (৩) মু'তাযিলাহ---এরা ৬ দলে বিভক্ত (৪)
মরজিয়্যাহ---এরা ১২ দলে বিভক্ত (৫) শিয়া---এরা ৩২ দলে বিভক্ত (৬) জাহমিয়্যাহ---এরা
১ দলে বিভক্ত (৭) নাজ্জারিয়্যাহ---এরা ১ দলে বিভক্ত (৮) জেরারিয়্যাহ---এরা ১ দলে
বিভক্ত (৯) কিলাবিয়াহ---এরা ১ দলে বিভক্ত (১০) মুশাব্বিহা---এরা ৩ দলে বিভক্ত
উল্লেখিত সবগুলো দল মিলে ৭৩ দল হলো, যে সম্পর্কে সাইয়িদুল
মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে
এরশাদ করেছেন । উক্ত দলগুলোর মধ্যে শুধুমাত্রর ১টি দলই নাজাত প্রাপ্ত আর সেটা হল ফিরক্বায়ে
নাজী অর্থাৎ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত"
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় মিরকাত শরীফের শরাহ তানজীমুল
আশতাত কিতাবের ১ম খন্ডের ১২৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
"হাদীস শরীফে যে ৭২টি ফিরক্বাহ কথা উল্লেখ আছে
উক্ত ফিরক্বাহসমূহের মুলে হলো ৬টি যথাঃ (১) খারেজী---এরা ১৫ দল (২) শিয়া---এরা ৩২
দল (৩) মু'তাযিলাহ---এরা ১২ দল (৪) জাবারিয়্যাহ---এরা ৩ দল (৫) মরজিয়্যাহ---এরা ৫
দল (৬) মুশাব্বিহা---এরা ৫ দল উল্লেখিত সবগুলো দল মিলে ৭৩টি দল,যে সম্পর্কে সাইয়িদুল
মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে
এরশাদ করেছেন । উক্ত দলগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র ১টি দলই নাজাত প্রাপ্ত, আর সেটা হলো
"ফিরক্বায়ে নাজী" অর্থাৎ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত"
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বিশ্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস
হযরত শায়খ আব্দুল হক দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি আশয়াতুল লোমাত কিতাবের ১ম খন্ডের
১৫১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন যে,
"ইসলামের বড় দল ৮টি । যথাঃ (১) মু'তাযিলাহ---এরা
২০ দল (২) শিয়া ---এরা ২২ দল (৩) খারেজী---এরা ২০ দল (৪) মরজিয়্যাহ---এরা ৫ দল (৫)
নাজ্জারিয়্যাহ---এরা ৩ দল (৬) জাবারিয়্যাহ---এরা ১ দল (৭) মুশাব্বিহা---এরা ১ দল
(৮) নাজিয়্যাহ---এরা ১ দল"
উল্লেখ্য, ইমাম-মুজতাহিদগণ ৭২টি বাতিল ফিরক্বাহ নাম
ও সংখ্যার ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করলেও নিম্নে বর্ণিত মূল দলগুলো বাতিল ও জাহান্নামী
হওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমতঃ (১) খারেজী (২) শিয়া (৩) মরজিয়্যাহ (৪) জাহমিয়্যাহ
(৫) মু'তাযিলাহ (৬) ক্বদরিয়া (৭) জাবারিয়্যাহ (৮) মুশাব্বিহা ।
কারণ উক্ত ৮টি দলের প্রত্যেকেই কালিমা পাঠ করে, নামায,
রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি ফরয-ওয়াজিব ও সুন্নত আমল গুলোও প্রায় পালন করে । এমনকি
অনেক বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ন্যায় আক্বীদা পোষণ করে । অথচ তার পরেও
তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে গোমরাহ, বাতিল ও জাহান্নামী । কারণ তারা কোন কোন ক্ষেত্রে কূফরীমূলক
আক্বীদা পোষণ করে ।
চোখ থাকতে অন্ধভাবে কারো অনুসরন না করে কুরআন হাদিসের
সাথে মিলিয়ে ইবাদত করুনঃ-
পরকালীন জীবন অনন্তকাল যেখানে থাকতে হবে, যে জীবনের
কোন শেষ নেই, সে জীবনের পাথেয় তথা নেকী অর্জন করতে হ’লে, যাচাই-বাছাই করে আমল করা
অতীব জরূরী ।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ ! যদি ফাসেক বা পাপাচারী
তোমাদের নিকট কোন খবর আনয়ন করে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা
কোন সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও’
{হুজুরাত ৬}
দেশে ধর্মীয় গোরামীর কিছু জ্ঞান পাপি লোক আছে, তাদের
নিকট কুরআন ও ছহীহ হাদীছের কথা বলাই মুশকিল । কারণ মুরুব্বীদের সাথে নাকি আদবের সাথে
কথা বলতে হয় । তাদের কথা যাচাই-বাছাই না করে গ্রহণ করলে কোন কথা নেই । কিন্তু ভুল
ধরিয়ে দিয়ে সঠিকটা পেশ করলেই আদবের প্রশ্ন উঠে । তখন তারা রেগে গিয়ে বলেন, রাখুন
আপনার কুরআন-হাদীছ ! অত যাচাই-বাছাই করতে গেলে শেষে কম্বলের খোঁজই থাকবে না । অর্থাৎ
কম্বলের পশম বাছাই করতে গেলে শেষে কম্বল থাকবে না । তারা আরো বলেন, কত মানুষ যে ছালাতই
পড়ে না ? তার খোঁজ-খবর নেই, আপনি আসছেন কুরআন হাদিস দেখাতে ? যে যেমনভাবে পারে ইবাদত
করুক, এতে কিছু আসে যায় না । শুধু কুরআন-হাদীছ মানলেই চলবে না । নাউযুবিল্লাহ !
তওবাঃ-
সূরা আয-যুমার-৫৩> বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা
নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, অবশ্যই আল্লাহ
সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ ।কিন্তু যারা তওবা করবে,
ঈমান আনবে এবং ভালো কাজ করবে আল্লাহ তাদের খারাপ কাজসমূহকে ভাল কাজ দ্বারা পরিবর্তন
করে দিবেন । আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু (ফুরকান আয়াত ৭০)
কিন্তু যারা তওবাহ করে ও নিজেদের কর্মনীতির সংশোধন
করে নিবে এবং যা গোপন করেছিল তা প্রকাশ করে, আমি তাদের ক্ষমা করে দিব । প্রকৃত পক্ষে
আমি তওবাহ গ্রহনকারী ও দয়ালু (বাকারাহ আয়াত ১৬০)
আবু মুসা আব্দুল্লাহ বিন কায়েস আল-আশআরী (রাঃ) বর্ণিতঃ
নবী (সাঃ) বলেছেনঃ পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ
দিনের অপরাধীদের ক্ষমা করার জন্য রাতে এবং রাতের অপরাধীদের ক্ষমা করার জন্য দিনে ক্ষমার
হাত প্রসারিত করে রাখেন (মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৮ পৃঃ)