“নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন” নারীর জন্য পুরষ নির্যাতনের হাতিয়ার
নারী-শিশু নির্যাতন আইনে করা ৮০ ভাগ মামলাই মিথ্যা
নারী এবং শিশুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণীত হলেও বর্তমানে এটি প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্বামীকে বাগে রাখা, দেন মোহর আদায়, পরকীয়া প্রকাশ পাওয়ায় পর সংসার টিকিয়ে রাখতে, শশুর-শাশুড়িকে শায়েস্তা করা, প্রেম করে পালিয়ে যাওয়া মেয়েকে উদ্ধার কিংবা তুচ্ছ কোনো কারণে প্রায়ই প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য মামলা করা হয় এই আইনে। অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা করেও পার পেয়ে যায় বাদী। কোনো সাজা তাকে পেতে হয়না। দেশের নির্যাতিত নারী ও শিশুদের রক্ষা ও অপরাধীদের শাস্তি দিতে প্রথমে ১৯৮৩ সালে নারী নির্যাতন অধ্যাদেশ (৬০ নং) জারি করা হয়। এরপর এই আইনের আরো কঠোর প্রয়োগের জন্য ১৯৯৫ সালে পূর্ববর্তী আইনটি বাতিল করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ১৯৯৫’ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তিতে ১৯৯৫ সালের আইনের দুর্বলতা, অস্পষ্টতা ও বিভিন্ন ক্রটি-বিচ্যুতি দূর করে সময়োপযোগী করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে এটি একটি কঠোর আইন। এ আইনে দাহ্য পদার্থ দিয়ে কৃত অপরাধ, নারী পাচার, শিশু পাচার, নারী ও শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা, যৌন নির্যাতন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানিজনিত অপরাধের বিচার ও শাস্তির কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ছাড়াও অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড করার কথাও বলা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক থাকলে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার করার কথা বলা হয়েছে এ আইনে। তবে মিথ্যা মামলা করা বা অভিযোগ দায়েরকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথাও বলা আছে এই আইনে। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল এ আইনের আওতায় সংঘটিত অপরাধের জন্য বিচার প্রার্থীদের প্রতিকার প্রদান করা এবং অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে ভূক্তভোগীদের রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা পুরোপুরি হতাশাজনক। ঢাকার পাঁচটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করে যে চিত্র পাওয়া গেছে তা হলো, এ আইনের অধীনে দায়ের করা অধিকাংশ মামলাই চূড়ান্তভাবে শেষ হয়না। তাই অনেকে এসব মামলার অধিকাংশকেই মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীতে বনিবনা না হওয়ার কারণে অথবা পরকীয়া প্রেমের কারণে অথবা যৌক্তিক অন্য কোনো কারণে স্বামীর দেওয়া তালাকের নোটিশ পাওয়ার পর স্ত্রী তালাকের পূর্বের একটি তারিখে মিথ্যা ও কাল্পনিক ঘটনার বর্ণনায় মামলা করে থাকে। মূলত বাদী পক্ষের লোকজন প্রতিপক্ষের উপর মনের ঝাল মিটানোর উদ্দেশ্যে নারী নির্যাতনের মামলা করেন। এর মাধ্যমে তাড়াতাড়ি দেনমোহরের টাকা আদায় করা যায়। এ বিষয়ে ৩ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মাহমুদা আক্তার এর বাস্তবতা স্বীকার করে বলেন, তিনি দেড় বছর ধরে পাবলিক প্রসিকউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় ৩ হাজারের মতো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এ সময়ে। সর্বোচ্চ ৭/৮ টি মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে আসামিদের। বাকি সব মামলায়ই আসামিদের খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দেড় বছরের পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে শতকরা ৮০ ভাগ মামলাই মিথ্যা। এ ব্যাপারে ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এর স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট আব্দুল বারি বলেন, ‘শতকরা ৯০ ভাগ মামলাই ভুয়া।’ তিনি বলেন, একস্থানের ঘটনায় প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্য অন্যস্থানে গিয়ে মামলা করা হয়। যেমন বাদির বাড়ি কুমিল্লায়। মামলা করলে তাকে কুমিল্লায় করতে হবে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করার জন্য বাদীকে ঢাকায় কোনো আত্মীয়স্বজনের ঠিকানায় রেখে বা বাদীর ঢাকাস্থ কোনো ঠিকানা দেখিয়ে এই আইনের অধীনে মামলা করা হয়। তিনি আরো বলেন, মাত্র ১৫০০-২০০০ টাকায় মেডিকেল সার্টিফিকেট সরবরাহ করার দালাল রয়েছে আদালত এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ওইসব সার্টিফিকেট দিয়ে স্ত্রীকে নির্যাতন করা হয়েছে উল্লেখ করে মামলা করা হয়। একই বিষয়ে ২ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি মো. আলী আকবরও বলেন প্রায় একই কথা । তিনি বলেন, ‘পারিবারিক বিষয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে এবং বিরোধের একেবারে শেষের দিকে ১১ (গ) ধারায় (যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা বা মারাত্মক জখম বা সাধারণ জখম) মামলা হয়। এ জাতীয় শতকরা ৯৯ ভাগ মামলায় কোনো সাজা হয়না।’ অনেকে মনে করেন ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ একটি কঠিন আইন। ফলে এ মামলায় সহজেই প্রতিপক্ষকে হেনস্থা করা যায়। তার মতে এ আইনে মিথ্যা মামলা করা বা অভিযোগ দায়েরকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এ মামলার অপপ্রয়োগ। https://www.facebook.com/groups/1527752050803466
No comments:
Post a Comment